মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

আবু হোসেন সরকার, জন্ম: ১৮৯৪, মৃত্যু: ১৯৬৯

দেশের এক জনপ্রিয় রাজনীতিক আবু হোসেন সরকার। তিনি গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার খোর্দ্দ কোমরপুর গ্রামে ১৮৯৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ সরকার ছিলেন ঐ এলাকার একজন অবস্থাপন্ন কৃষক। মাত্র আড়াই বছর বয়সে আবু হোসেন সরকার পিতাকে এবং এগার বছর বয়সে মাতাকে হারান।

আবু হোসেন সরকার ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। শিক্ষাজীবনের সকল পর্যায়ে তিনি মেধার স্বাক্ষর রাখেন। তিনি নিজ এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বৃত্তিসহ প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। কিন্তু কৈশোরে স্বদেশী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার কারণে তাঁর পড়াশুনা ব্যাহত হয়। ১৯১১ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি গ্রেফতার হন। ১৯১৫ সালে আবু হোসেন সরকার স্টার মার্কসহ প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২২ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে তিনি অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর কিছুদিন তিনি সাদুল্লাপুর ও বাসুদেবপুর হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। তারপর আ্ন বিষয়ে পড়াশুনার জন্য তিনি কলকাতা যান। কোলকাতা আইন কলজ থেকে বিএল ডিগ্রী লাভের পর ফিরে এসে আবু হোসেন সরকার রংপুরে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

কোলকাতার আইন পড়ার সময় আবু হোসেন সরকার মহাত্মা গান্ধী, মওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কংগ্রেসে যোগদেন এবং জাতীয় আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯২০ সালের এপ্রিল মাস থেকে মওলানা মোহাম্মদ আলী এবং মওলানা শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে শুরু হয় অহিংস অসহযোগ আন্দোলন। ১৯২১ সালে এই আন্দোলন পরিণত হয় জাতীয় আন্দোলন এবং ১৯৪২ সালে শুরু হওয়া ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনসহ সকল বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য আবু হোসেন সরকার রাজনীতির সম্মুখ সারিতে উঠে আসে। এ সময় তিনি কয়েকবার কারারুদ্ধ হন। এসব আন্দোলনে গাইবান্ধার অন্যান্য যাঁরা ভূমিকা রাখেন তাঁরা হচ্চেন- মহিউদ্দিন খাঁ, আহমদ হোসেন, তুলসীঘাটের জমিদার বিজয় রায় চৌধুরী, আহমদ খাঁ, স্বামী খানোনন্দ, অন্নদা সেন, হরিশচন্দ্র চৌধুরী, হেমন্ত সরকার, বেনীমাধব দাস, ব্রজমোহন দাস, দৌলতন নেছা খাতুন, ডা: শ্রীশ চন্দ্র সরকার, মজিবর রহমান, সুরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী প্রমুখ। ১৯৪২ সালের ২০ আগস্ট রংপুর শহরে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি এবং কৃষক প্রজা পার্টির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বিরাট জনসভায় সভাপতিত্ত্ব করেন আবু হোসেন সরকার।

রাজনৈতিক জীবনের এক পর্যায়ে কংগ্রেস নেতাদের সাথে মতভিন্নতার কারণে আবু হোসেন সরকার কংগ্রেস ত্যাগ করে ১৯৩৫ সালে এ.কে ফজলুল হকে কৃষক প্রজা পার্টিতে যোগ দেন। কৃষক প্রজা পার্টি সারা বাংলায় জনপ্রিয় দলে পরিণত হয়। ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টির ১২ দফা ইশতেহার প্রণয়নে আবু হোসেন সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ঐ ইশতেহার কৃষক কৃষক-প্রজার স্বার্থ সংরক্ষণ করায় তা কৃষক প্রজাদের সমর্থন লাভ করে। ইশতেহাররের গুরুত্বপূর্ণ দাবীগুলো ছিল: (১) বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারী প্রথার উচ্ছেদ, (২) মহাজনী সুদের কারবার নিয়ন্ত্রণ, (৩) ঋণ সালিশী বোর্ড গঠন করে কৃষকদের ঋণ মুক্ত করা, (৪) বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু, (৫) স্বদেশে পূর্ণ স্বায়ওশাসন, প্রতিষ্ঠা, (৬) সরকারী প্রশাসনের ব্যয় কমানো, (৭) মন্ত্রীদের মাসিক বেতন এক হাজার টাকার নীচে আনা, (৮) রাবন্দীদের মুক্তি। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদ (সংসদীয়) এর নির্বাচনে আবু হোসেন সরকার কৃষক প্রজা পার্টির প্রার্থী হিসেবে সদস্য নির্বাচিত হন। ঐ  নির্বাচনে গ্রামাঞ্চলে যাঁরা নূন্যতম ছয় আনা চৌকিদারি নির্বাচনে ২১৩ জন সদস্যের মধ্যে ৭৪ জনই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। দলওয়ারী নির্বাচনের ফলাফল ছিল নিম্নরূপ: কংগ্রেস-৫৪, মুসলিমলীগ-৪০, কৃষক প্রজা পার্টি-৩৫, ত্রিপুরা কৃষক পার্টি-০৫, জাতীয়তাবাদী-০৩, হিন্দু মহাসভা-২, স্বতন্ত্র (মুসলমান)-৪২, স্বতন্ত্র (হিন্দু)-৩২।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর আবু হোসেন সরকার রংপুর জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৩ সালে এ.কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক শ্রমিক পার্টি গঠনে আবু হোসেন সরকার অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের জন্য দেয়া যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচীর প্রচারে তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। গ্রামাঞ্চলের মানুষকে সহজ সরল ভাষায় বক্তৃতা করে বুঝানোর পাশাপাশি মুসলিম লীগের ধর্মের জিগিরের বিপক্ষে আবু হোসেন সরকার বৃহত্তর রংপুরের সর্বত্র জনমত সংগঠিত করেন জনসভার মাধ্যমে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ৮ থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ৩০৯টি আসনের মধ্যে ২২৮টি আসনে জয়লাভ করে যুক্তফ্রন্ট। এর মধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ-১৪৩, কৃষক শ্রমিক পার্টি-৪৮, নেজামে ইসলামে-২২, গণতন্ত্রী দল-২৩, খেলাফতে রব্বানী পার্টি-০২ আসন পায়। মুসলিম লীগ জিতে মাত্র ০৯টি আসনে। ১৯৫৪ সালের এপ্রিলে শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হককে মুখ্যমন্ত্রী করে গঠিত যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভায় আবু হোসেন সরকার অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। কিন্তু এই মন্ত্রীসভার স্থায়ীত্বকাল ছিল মাত্র ৫৭ দিন। ১৯৫৪ সালের ৩০ মে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার মোহাম্মদ আলী কমিউনিস্ট বিশৃঙ্খলা দমনে ব্যর্থতার অভিযোগে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা বাতিল করে ৯২ (ক) ধারা জারির মাধ্যমে পূর্ব বাংলায় গভর্নরের শাসন কায়েম করেন। সারাদেশে নির্বিচারে গ্রেফতার ও নির্যাতন শুরু হয়। কমিউনিস্ট পার্টিকে আবার বেআইনী ঘোষণা করা হয়। ১৯৫৪ সালের ডিসেম্বরে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় আবু হোসেন সরকারকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

১৯৫৫ সালের ৩ জুন পূর্ব বাংলা থেকে ৯২ (ক) ধারা প্রত্যাহার করা হলে ৬ জুন আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বে ৫ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রীসভা গঠন করা হয়। ১৯৫৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি পূর্ব বাংলায় মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন এ সরকারের সময় গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো হচ্ছে ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দান, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ, শাসনতন্ত্রে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট ভাষার মর্যাদা দান, বাংলা নব্বর্ষ উপলক্ষে পহেলা বৈশাখ সরকারী ছুটি ঘোষণা ইত্যাদি। ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বর্তমান হাউসে বালা একাডেমীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার। আর ১৯৫৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার একুশে ফেব্রুয়ারি সরকারী ছুটি ঘোষণা করে। সে বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতেই তিনি কেন্দ্রীয় শহদী মিনারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।

১৯৫৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে আকস্মিকভাবে খাদ্য সংকট দেখা দেয় এবং খাদ্যদ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। এর প্রতিবাদে ৪ আগস্ট ঢাকায় এক বিশাল ভুখা মিছিল বের হলে পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েকজন হতাহত হয়। প্রাদেশিক পরিষদের বেশ কিছু সংখ্যক সদস্য দলত্যাগ করেন। ৩০ আগস্ট আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রীসভা পদত্যাগ করে। পূর্ব বাংলায় আবার জারী করা হয় গভর্নরের শাসন। ১৯৫৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৫৮ সালে সাময়িক শাসন জারি পূর্ব পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে বিরোধী সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন তিনি। এসময় তিনি কৃষক-শ্রমিক পার্টির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। আইয়ুব খানের সাময়িক সরকার তাঁর উপর নির্বাচনী নিষেধাজ্ঞা (এবডো) আরোপ করে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদীর নেতৃত্বে ১৯৬২ সালে ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬২ সালের ২৫ জুন আইয়ুব খানের প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্র প্রত্যাখান করে দেশের শীর্ষ যে ৯ জন রাজনৈতিক নেতা বিবৃতি দেন তাঁদের অন্যতম ছিলেন আবু হোসেন সরকার।

আবু হোসেন সরকার রাজনীতি চর্চায় ছিলেন পরমতসহিঞ্চু এবং উদার মনমানসিকতার। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় গাইবান্ধার আন্দোলনকারী নেতাদের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ সরকার হয়রানীমূলক মামলা দায়ের করে। আবু হোসেন সরকার রংপুর আদালতে বিনা সম্মানীতে এসব মামলা পরিচালনা করেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীদের প্রতি তাঁর ছিল প্রগাঢ় ভালবাসা। সরকারী নির্যাতন ও নিপীড়নে পর্যুদস্ত কমিউনিস্ট নেতা ধীরেন ভট্টাচার্য, তাঁর স্ত্রী সন্ধ্যা ভট্টাচার্য ও বোন মিলা ভট্টাচার্য পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করলে তিনি তা মঞ্জুর করেন। রংপুর জেলা ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি সুফী মোতাহার হোসেনের অতিরঞ্জিত পুলিশ রিপোর্ট তিনিই প্রত্যাহার করেন। বৃহত্তর রংপুর বিশেষত গাইবান্ধায় অসংখ্য ছাত্র তাঁর বাসায় থেকে পড়াশুনা করেছে এবং অনেক রাজনৈতিক নেতা কর্মীকে তিনি উদার হস্তে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন।

১৯৬৯ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবু হোসেন সরকার মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে বাংলার এই মহান নেতাকে সমাহিত করা হয়।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। -জহুরুল কাইয়ুম

 

তুলসী লাহিড়ী, জন্ম:১৮৯৭, মৃত্যু: ১৯৫৯

তুলসী লাহিড়ী রংপুর (বর্তমান গাইবান্ধা) জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গায় জমিদার পরিবারে ১৮৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সুরেন্দ্র চন্দ্র লাহিড়ী এবং মাতার নাম শৈলবালা দেবী। তুলসী লাহিড়ীর পিতৃদত্ত নাম হেমেন্দ্র চন্দ্র লাহিড়ী। স্কুলে ছাত্রাবস্থায় বড়লাট লর্ড কার্জনের সময়ে ১৯০৫ সালে হয় বঙ্গভঙ্গ। বঙ্গভঙ্গের কারণে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। আর দশজন স্কুল পড়ুয়া বন্ধুর সাথে মিলে তিনি পুলিশের নজরে বড়লাট ‌‘কার্জন বিরোধী’ আন্দোলনে সামিল হন। তিনি পুলিশের নজরে পড়েন। তাঁর নামে জারি হয় গ্রেফতারী পরোয়ানা। ভীত সন্ত্রস্ত পিতা সুরেনন্দ্র চন্দ্র লাহিড়ী উপায়ন্তর না দেখে কোচবিহারে তাঁর পিতৃদেবের করদমিত্র রাজ্য হওয়ায় ব্রিটিশ শাসনের বাইরে ছিল। গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হওয়ার কারণে নলডাঙ্গার স্কুল কর্তৃপক্ষ ‘রাজটিকেট’সহ হেমেনকে স্কুল থেকে যথারীতি বহিস্কার করেন। হেমেনের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কোচবিহারে সে সময় কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কাছেকূলে বিহার প্রদেশ। কিন্তু তা ব্রিটিশ শাসনাধীনে। সাব্যস্ত হলো, এফিডেভিটের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন। হেমেন্দ্র চন্দ্র লাহিড়ী রাতারাতি বনে গেলেন তুলসীদাস লাহিড়ীতে। বিহার থেকে বি.এ পাশ করে তিনি চলে আসেন কলকাতায়। কলকাতা আইন কলেজ থেকে বি.এল পাশ করন। সে সময়ে রংপুরের মোহাম্মদ ওয়ায়েস, বদিরউদ্দিন আহমদ প্রমুখ ছিলেন তাঁর সহপাঠী। রংপুরে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। ঐতিহ্যবাহী নাট সংগঠন রঙ্গপুর নাট্যসমাজের সাথে তিনি যুক্ত হন। রঙ্গপুর নাট্যসমাজ রঙ্গমঞ্চে নাটকাভিনয়ে হয় তাঁর হাতেখড়ি। তুলসী লাহিড়ী অভিনীত প্রথম নাটক ‌‘কর্ণার্জুন’। ‘মিশরকুমারী’,  ‘কিন্নরী’,  ‘ব্যাপিকা বিদায়’ প্রভৃতি নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। রঙ্গপুর নাট্যসমাজ রঙ্গমঞ্চে সাফল্যের সাথে মঞ্চস্থ হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিরকুমার সভা’। এ নাটকে অক্ষয়ের ভূমিকায় প্রবোধ মুখার্জী এবং রসিকের ভূমিকায় অীভনয় করেন তুলসী লাহিড়ী। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রপাধ্যয়ের ‘দত্তা’ উপন্যাসের নাট্যরূপ দান করেন প্রবোধ মুখার্জী। নাটকের নাম ‘বিজয়া’। তুলসী লাহিড়ী এ নাটকেও অভিনয় করেছেন।

পিতার কাছে সঙ্গীতচর্চায় হয় তাঁর হাতেখড়ি। রংপুরে নানা অনুষ্ঠানে সঙ্গীতের ব্যবস্থা করতেন পিতা সুরেন্দ্র চন্দ্র লাহিড়ী। রংপুর ইন্সটিটিউট ক্লাব নানা ধরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো। তুলসী লাহিড়ী ও তাঁর বন্ধুবান্ধবদের সহযোগিতায় সেসব অনুষ্ঠান হতো প্রাণবস্ত। ‘রঙ্গপুর সারস্বত সম্মেলন’ আরেক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান। সারস্বত সম্মেলন ভবনেও আয়োজিত হতো বিভিন্ন উপলক্ষ্যে নানা অনুষ্ঠান। রংপুর ইন্সটিটিউট ক্লাবের সদস্য ছিলেন লাহিড়ী। ক্লাবের পক্ষ থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে তিনি কলকাতা থেকে গায়ক ও বাদক দলকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতেন।

দোলপূর্ণিমায় উৎসব হতো। তুলসী লাহিড়ী, তাঁর সংগীতরসিক ভাইরা ও অন্যান্য বন্ধুবান্ধব আবির মেখে অভিনব সাজে সজ্জিত হতেন। এরপর তাঁরা লরিতে চেপে সভ্যদের বাড়ীতে যেতেন। তাদেঁর কাছে চাঁদা আদায় করতেন। বিকেলে অনুষ্ঠিত হতো ভোজসভা। সেই অনুষ্ঠানে তুলসী লাহিড়ীর অনুজ গোপাল লাহিড়ী ক্লারিওনেট, শ্যামাদাস লাহিড়ী এসরাজ এবং স্বয়ং তুলসী লাহিড়ী বাজাতেন জলতরঙ্গ। রংপুরে থাকাকলে তুলসী লাহিড়ীর বন্ধুবান্ধব ও অনুরাগীদের বাড়ীতে মাঝে মাঝে অনুষ্ঠিত হতো গানের আসর। মধ্যরাত পর্যন্ত গোপাল লাহিড়ী এধরণের অনুষ্ঠানে বাঁশীতে বাজাতেন দরবারী কানাডা।

বাংলা নাট্যসাহিত্যে তুলসী লাহিড়ীর আর্বিভাবের পটভূমি পর্যালোচনায় দেখা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯ সাল) থেকে দেশভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার (১৯৪৭ সাল) পূর্বক পর্যন্ত এদেশের বুকের ওপর দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের ন্যা কতগুলো বিশেষ বিশেষ ঘটনা সংঘটিত হয়। যেমন সর্বগ্রাসী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫), ১৩৫০ বঙ্গাব্দের (১৯৪৩ সাল) মহামন্বন্তর ও শেষে দেশ বিভাগ ঘটনায় সামাজিক জীবনে সৃষ্টি হয় প্রবল প্রতিক্রিয়া। ১৯৩৯ সাল থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরবর্তীকালে ঘটনাবলী অবলম্বনে তুলসী লাহিড়ী রচনা করেছেন তাঁর নাটকসমূহ।

রঙ্গপুরের গ্রামীণ কাহিনী, জনজীবনের দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও বহুবিধ সমস্যা বাস্তব সত্যের স্পর্শে জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে তাঁর নাকটগুলোত। রঙ্গপুরের লোকমুখের ভাষায় ‘ছেঁড়াতার’ ও ‘দু:খীর ইমান’ নাটক দুটি রচনা করে তিনি অসামন্য খ্যাতির অধিকারী হয়েছেন। পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমিকায় রঙ্গপুর জেলার গ্রাম্য কৃষকসমাজকে ভিত্তি করে তিনি রচনা করেছেন ‘ছেঁড়াতার’ নাকট। এই সমাজে একটি বিশেষ পরিবারের দু:খ বেদনার কাহিনী ‘ছেঁড়াতার’ নাটকের মুখ্য বর্ণনীয় বিষয়। তাঁর ‘‌দু:খীর ইমান’ নাটকটিও রচিত হয়েছে পঞ্চাশের মহান্বস্তরের পটভূমিকায়। ‘ছেঁড়াতার’ ও ‘‌দু:খীর ইমান’ নাটক দুটিতে গ্রামীণ পরিবেশের সাধারণ মানুষের সুখ-দু:খ, আশা-আকাঙ্খার চিত্রাঙ্কন সার্থক হয়েছে। বহুরূপী সম্প্রদায় অভিনীত ‘ছেঁড়াতার’ নাটক কলকাতার রঙ্গমঞ্চে বিশেষ সংবর্ধিত হয়েছিল।

তুলসী লাহিড়ী রচিত ‘পথিক’ (১৩৫৮) নাটকে বর্ণিত ঘটনাধারা এরূপ ‘কালের যাত্রা চলেছে অব্যাহত বেগে। সেই যাত্রাপথের পরিবর্তন হয়, পরিবর্তন হয় পথিকেরও। আজিকার সংশয় ও সংঘাত জড়িত পথে যে নতুন পথিকের চলা শুরু হয়েছে তার পদে পদে বাধা উপলখন্ড, বাঁকে বাঁকে অনিবার্য সংগ্রামের অশান্ত বিক্ষোভ। শ্রেণীতে আর মিলিত শান্তি নাই, এক শ্রেণীর সঙ্গে অপর শ্রেণীর নিদারুণ দ্বন্দ্ব কোলাহল নিশ্চিন্ত শান্তির পরিবেশ আজ নিষ্ঠুরভাবে পীড়িত।‘ বর্তমান জীবনের তিক্ত অথচ একান্ত সত্য দিকটি প্রকাশিত হয়েছে এ নাটকটিতে। ‘লক্ষ্মীপ্রিয়ার সংসার’ নাটকে দারিদ্র্য ও বঞ্চনা মানুষের জীবনকে কী শোচনীয় স্তরে টেনে আনে তাঁর মর্মান্তিক চিত্র রূপায়িত হয়েছে। তুলসী লাহিড়ী বিরচিত সর্বশেষ নাটক ‘ক্ষণিকের অতিথি’। অন্যান্য অনেক নাটকের ন্যায় ‘ক্ষণিকের অতিথি’ও মঞ্চ সফল দর্শক নন্দিত নাটক।

সমালোচক অজিত কুমার ঘোষ বলেন- ‘তিনি (তুলসী লাহিড়ী) সমাজ ব্যবস্থার গলদ সন্ধান করিয়াছেন ইহার প্রতিকারেরও ইঙ্গিত মাঝে মাঝে দিয়াছেন কিন্তু নাটকের প্রয়োজনের কাছে তাঁহার সমাজতত্ত্বের প্রয়োজন বড় হইয়া উঠে নাই। সেজন্য তাঁহার নাটকে আমরা নাট্যজীবনই দেখিতে পাই, তত্ত্বজীবন নহে।‘

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৩৯-১৯৪৫ খ্রি:) বাংলা নাট্যসাহিত্যের নবধারার সৃজনকাল। একালের তুলসী লাহিড়ী পালন করেছেন পথিকৃৎ-এর ভূমিকা। সমাজ জীবনের নানাবিধ সমস্যা, জীবন সংগ্রামের অভাব, সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির মর্মান্তিক অস্তিত্ব, নীতির অবক্ষয় এবং জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে নেমে আসা ধ্বসের চেহারা তুলসী লাহিড়ীর নাটকে জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়। সমসাময়িক নাট্যকারদের মধ্যে বিজন ভট্টাচার্য (১৯১৭-১৯৭৮ খ্রি:) দিগিন বন্দ্যোপাধ্যায় ও সলিল সেনের নামা আমরা বরতে পারি। বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালের ভয়াবহ সমাজ সমস্যার রূপকল্প নির্মাণে এসব নাট্যকারদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে বেকার সমস্যার তীব্রতা, গুপ্ত সন্ত্রাসবাদ, ইংরেজদের অত্যাচার, দেশ বিভাগ, উদ্বান্তু সমস্যা এবং চরিত্র ভ্রষ্টতার প্রকট নমুনা তুলে ধরতে নাট্যকারের জুড়ি ছিল না।

তুলসী লাহিড়ীর শিল্পীসত্তার আরেক বৈশিষ্ট্য সঙ্গীত রচয়িতা ও সুরকার হিসেবে। কলকাতায় বঙ্গবাসী কলেজে ছাত্রাবস্থার সঙ্গীতচর্চায় তিনি আত্মনিয়োগ করেন। প্রখ্যাত গায়ক কানাকৃষ্টের কাছে এ সময়ে তিনি গান শেখেন। এরপর তিনি লক্ষ্মৌতে চলে যান। গায়ক অতুলপ্রসাদ সেসময়ে ছিলেন লক্ষ্মৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তিনি তুলসী লাহিড়ীর গান শেখার ব্যবস্থা করেন। ‘রামপুরী ঘরানা’ খ্যাত ওস্তাদ সালামত আলী খানের সান্নিধ্যে তিনি আসেন। তাঁর কাছ থেকে উচ্চাঙ্গসংগীতের পাঠ তিনি গ্রহণ করেন। লক্ষ্মৌ থেকে পুনরায় তিনি চলে আসেন কলকাতায়। চলচ্চিত্রের সাথে তিনি যুক্ত হন। ‌হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ ও ‘মেগাফোন কোম্পানীতে’ কাজী নজরুল ইসলামের সাথে সঙ্গীতে তিনি কণ্ঠ মিলিয়েছেন। তুলসী লাহিড়ীর সংস্পর্শে এসে বিগত শতাব্দীর ত্রিশ-চল্লিশ দশকে সঙ্গীতশিল্পী কমলা ঝরিয়া (১৯০৬-১৯৭১) খ্যাতির অধিকারী হয়েছেন।

কলকাতার নাট্যমঞ্চেরও তিনি একজন সফল অভিনয় শিল্পী স্টার থিয়েটারের সাথে যোগাযোগ তাঁর জীবনে সুফল বয়ে আনে। অহীন্দ্র চৌধুরী, অপরেশ মুখোপাধ্যায়, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর গাঙ্গুলী, দানী বাবু প্রমুখের সংশ্রবে তিনি আসেন।

তুলসী লাহিড়ী নির্বাক যুগের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। পরিচালক হীরেন্দ্রনাথ বসু (১৯০২-১৯৮৭) তাঁর নির্বাক ছবি ‘‌চুপ’-এ অভিনয় করার জন্য সর্বপ্রথম তুলসী লাহিড়ীকে এনেছিলেন চলচ্চিত্রের পর্দায়। হাস্যরসাত্মাক অভিনয়ে তুলসী লাহিড়ী ছিলেন অনন্য। ‘যমুনা পুলিনে’ ছায়াছবির চিত্রকাহিনী ও গান তিনি রচনা করেছেন। ‘মনিকাঞ্চন’ ছায়াছবিতে তিনি প্রথম অভিনয় করেন। ‘রিক্তা’ ছায়াছবিতেও তিনি অভিনয় করেছন। ‘মনিকাঞ্চন’ ও ‘রিক্তা’ ছায়াছবির চিত্রনাট্য তিনি রচনা করেছেন। জানা যায়, পঞ্চশটিরও বেশি ছায়াছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। বহুমাত্রিক শিল্পপ্রতিভার অধিকারী ছিলেন তুলসী লাহিড়ী। তিনি ছিলেন মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রাভিনেতা, নাট্যকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, চিত্র নাট্যকার ও চিত্র পরিচালক। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের যুগনায়ক তুলসী লাহিড়ী ১৯৫৯ সালের ২২শে জুন কলকাতারয় পরলোকগমন করেন।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৬২ বছর।

 

মরহুম আতাউর রহমান বাদশা মিয়া (১৯৩৬ -১৯৯০)

আতাউর রহমান বাদশ মিয়া ১৯৩৬ইং ও ১৩৪৩ বাংলা সনের আশ্বিন মাসে সাদুল্লাপুর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের আলদাদপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম আলহাজ আফতাব উদ্দিন আহমেদ ফরিদপুর ইউনিয়নের ৪৮ বছর পঞ্চায়েত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী মরহুম বাদশা মিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত গ্রাম হতে। তার পিতা মরহুম আলহাজ আফতাব উদ্দিন আহমেদ ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট এবং স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে আজীবন লিপ্ত ছিলেন। এর ফলে ফরিদপুর ইউনিয়নের মানুষের সমর্থনে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী পঞ্চায়েত প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

 

মরহুম বাদশা মিয়া ১৯৬২ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ১৯৬৫ সালে সাদুল্লাপুর, সুন্দরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ- এই চার থানা মিলে তদানীন্তন জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় খাদ্য ও কৃষি মস্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি নিজ খরচে মোলংবাজার জামে মসজিদ, বকসীগঞ্জ হাইস্কুলের টিনসহ বকসীগঞ্জ পুল ও আর্ক সেন্টার স্থাপন করেন। এছাড়াও মরহুম বাদশা মিয়া কর্মজীবনে অসংখ্য স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, পুল, কালভার্ট, খেলার মাঠ নির্মাণসহ অসংখ্য জনকল্যাণমূলক কাজের সাথে আজীবন সম্পৃক্ত ছিলেন। যা আজও মানুষের মনে স্মরণীয় হয়ে আছে এবং থাকবে। মরহুম বাদশা মিয়া আজীবন মানুষের খাদেম হিসেবে কাজ করে গেছেন। ১৯৯০ সালের ২৫ মে তিনি পরলোক গমন করেন। এই ক্ষণজন্মা পুরুষ সবার কাছে চির স্মরণীয়।

 

মরহুম আবু তালেব মিঞা

গাইবান্ধার রাজনৈতিক অঙ্গনের এক জনপ্রিয় মানুষ ছিলেন মরহুম আবু তালেব মিঞা। মহান স্বাধীনতা সঙগ্রামের অন্যতম সঙগঠক এই জননেতা ১৯৩৬ সালে সাদুল্লাপুর উপজেলার ভাতগ্রাম ইউনিয়নের টিয়াগাছা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মৃত আলহাজ্ব তইজ উদ্দিন মিঞা।

রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে এমপিএ নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। ১৯৭৩ সালের সংসদ সদস্য নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বিভিন্ন সময়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সহ-সভাপতি এবঙ সাদুল্লাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক কাজের পাশাপাশি সামাজিক কার্যক্রমে মরহুম আবু তালেব মিঞা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি ১৯৭২ সালে গাইবান্ধা রেডক্রিসেন্ট এর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সাদুল্লাপুর উপজেলার শিক্ষা বিস্তারে তিনি অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সাংসদ থাকাকালে এক সাথে সাদুল্লাপুর উপজেলায় ২২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। তিনি সাদুল্লাপুর ডিগ্রী কলেজ এবঙ গালর্স কলেজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সাদুল্লাপুর থানাকে নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষার জন্য তিনিই প্রথম ঘাঘট নদী লুপ কাটিং এর ব্যবস্থা করেন।

দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ত্যাগী, সৎ, নিষ্ঠাবান, দেশপ্রেমিক রাজনীতিক আবু তালেব মিঞা গত ২০০৭ সালের ১৬ মে মৃত্যুবরণ করেন। গাইবান্ধা এবঙ দেশের রাজনীতি ক্ষেত্রে মরহুম এই নেতার অনন্য অবদানকে আমরা গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। তাঁর কাংখিত বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমেই আমরা তাঁর স্মৃতিকে চিরঞ্জীব রাখতে পারব। - জহুরুল কাইয়ুম

 

প্রফেসর ড. এম.আর সরকার : প্রকৃত শিক্ষাবিদের প্রতিকৃতি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর মকবুলার রহমান সরকার (যিনি এম.আর সরকার নামেই সমাধিক পরিচিত ছিলেন) গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার খোর্দ্দকোমরপুরে ১৯২৮ সালে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পিতা দেলোয়ার হোসেন সরকার ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মাত্র ৯ মাস বয়সে মা আসিয়া খাতুনকে হারান মকবুলার রহমান। পরে নানীর কাছে আদর-স্নেহে বড় হয়ে উঠেন তিনি।

মকবুলার রহমান সরকার নিজ গ্রামের বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষালাভ করেন। ১৯৪৪ সালে তুলশীঘাট কাশীনাথ হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক এবং ১৯৪৬ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আই.এস.সি পাশ করেন। ১৯৪৮ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় বি.এস.সি সম্মান ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য চাচা প্রখ্যাত রাজনীতিক আবু হোসেন সরকারের বাসায় উঠেন। সেখানে থেকেই তিনি ১৯৪৯ সালে পদার্থবিদ্যায় এম.এস.সি পার্ট-১ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম এবং ১৯৫০ সালে পার্ট-২ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন।

১৯৫১ সালে এম.আর সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন। ১৯৫২ সালে যুক্তরাজ্যের লিভারপুল ইউনিভাসর্সিটিতে পিএইচডি করতে যান। পিএইচডি লাভ করে ১৯৫৬ সালে দেশে ফিরে তৎকালীন ইষ্ট পাকিস্তান  এডুকেশন সাভর্ভিসের অধীনে রাজশাহী কজলজ পদার্থবিদ্যা বিভাগে যোগ দেন। ১৯৫৮ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে রীডার হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৬৩ সালে প্রফেসর পদে উন্নীত হন। ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি লিবিয়া ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দেশে ফিরে প্রফেসর সরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত পদার্থবিদ্যা ও ইলেকট্রনিক্স বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে বিভাগীয় প্রধান ও প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রফেসর মকবুলার রহমান সরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দক্ষতার সাথে ১৯৮২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সিন্ডিকেট ও সিনিটের চেয়ারম্যান ও সদস্য, একাডেমিক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদ্য, বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের সদস্য, আমেরিকান এসোসিয়েশন ফর দ্যা এডভ্যান্সমেন্ট সাইন্সের সদস্য, বরেন্দ্র গবেষণা মিউজিয়ামের চেয়ারম্যান, ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ ষ্টাডিজের বোর্ড অব গভর্নরসের চেয়ারম্যান প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। প্রফেসর সরকার শিক্ষা সংক্রান্ত কাজে অষ্ট্রোলিয়া, কানাডা, বেলজিয়াম, চীন, ইংল্যান্ড, সাইপ্রাস, ডেনমার্ক, জার্মানি, হল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, লেবানন, পকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, লিবিয়া, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, সিরিয়া, থাইল্যান্ড সফর করেন।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালে প্রফেসর এম আর রহমান সরকার লিবিয়াতে থেকেও তহবিল সঙগ্রহ এবঙ জনমত সঙগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতাযুদ্ধ পূর্ব দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শিক্ষক সমাজের স্মরণীয় অবদানের সাথে তিনি একাত্ম ছিলেন। স্বাধীনচেতনা ও গণতান্ত্রিক মানসিকতা সম্পন্ন প্রফেসর সরকার সামরিক শাসন এবং অপশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। আবার শিক্ষক রাজনীতির নামে লাভালাভ এবং নোংরামীকে ঘৃণা করতেন। নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং কর্মক্ষেত্রে অধিকহারে তাদের অংশগ্রহণের উপর গুরুত্ব দিতেন প্রফেসর সরকার। সে কারণে তিনি স্ত্রী খুজিস্তা আখতার ফাসিহাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করেছেন। পিতা হিসেবে ছেলে ও মেয়েকে সমানভাবে সুশিক্ষিত করে গেছেন।

ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত সৎ,নীতিনিষ্ঠা এবং কর্তব্যপরায়ন প্রফেসর মকবুলার রহমান সরকার ১৯৮৫ সালের ১৯ মে মৃত্যুবরণ করেন। গাইবান্ধা কৃতি সন্তান হিসেবে আমরা প্রফেসর সরকারকে নিয়ে গর্ব করতে পারি। আমাদের প্রয়োজনেই আমরা তাঁকে স্মরণ করব আরো অনেক দিন। - জহুরুল কাইয়ুম

ছবি